সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

article-2309215-1947C892000005DC-301_634x413.jpg

নির্মম ইতিহাস রেড ইন্ডিয়ানদের কথা

আপন অস্তিত্ব বাঁচাতে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে রেড ইন্ডিয়ানরা। তবু শেষ রক্ষা হয় না। একে একে ব্যর্থ হয়ে যায় তাদের আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধের যাবতীয় প্রচেষ্টা; যার আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটে ‘উ্যনডেড নি’ এক পার্বত্য খাড়ির বাঁকে।

দূর দ্বীপবাসী:
সমুদ্রে ভেসে ভেসে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের তরী এসে ভিড়ল এক অজানা দ্বীপে। দলবল নিয়ে এখানেই নেমে পড়লেন তিনি। হাঁটু সমান লম্বা প্রেইরি ঘাস বাতাসে মাথা দুলিয়ে অভ্যর্থনা জানালো তাদের। রকি পর্বতমালার চূড়ায় বসে মুচকি হাসল সূর্য্য। আর বিস্তীর্ণ চারণভূমিতে ঘুরে বেড়ানো বুনো মোষের দল মাথা তুলে একবার দেখে নিল এ আগন্তুক দলকে। 

মুগ্ধ হলেন কলম্বাস! বিস্মিত হলেন! সবচেয়ে বেশি অবাক হলেন এ দ্বীপবাসীর আতিথেয়তায়। অতঃপর লিখতে বসলেন রানীকে: ‘... এখানকার মানুষজন এতই সুবোধ ও শান্তিপ্রিয় যে, মহামান্য রাজপদে আমি শপথ করে বলতে পারি, সারা দুনিয়াতে এদের চেয়ে ভালো জাতি আর নেই। প্রতিবেশিদের তারা একান্ত আপনজনের মতোই ভালোবাসে। তাদের আচার আচরণও অতীব ভদ্র এবং মিষ্টি। এটা অবশ্য ঠিক যে তারা বেশ কিছুটা নগ্ন…।’

রানী ইসাবেলার (স্পেনের রানী) কাছে ‘বেশ খানিকটা নগ্ন’ বলে কলম্বাস যে জনগোষ্ঠীর পরিচয় দিলেন তারাই আমেরিকার সবচেয়ে প্রাচীণ আদিবাসী ‘রেড ইন্ডিয়ান'।

কলম্বাসের ভুল:
ইচ্ছা ছিল ভারতবর্ষ খুঁজে বের করা এবং সে উদ্দেশ্যেই তরী ভাসিয়েছিলেন কলম্বাস। কিন্তু পথ ভুল করে উপস্থিত হলেন উত্তর আমেরিকার এক দ্বীপপুঞ্জে এবং মনে করলেন তিনি এসে পৌঁছেছেন ইন্ডিয়ায়। অতঃপর এ দ্বীপপুঞ্জের নাম দিলেন ‘ওয়েস্ট ইন্ডিস’! আর স্থানীয় অধিবাসীদের অভিহিত করলেন রেড ইন্ডিয়ান বলে।

কলম্বাসের সেই ভুল আজ অব্দি চলে আসছে।

লাল নয় রেড ইন্ডিয়ান:
রেড ইন্ডিয়ান নাম শুনে মনে হতে পারে এরা বুঝি লালচে বর্ণের মানুষ। কিন্তু আদৌ তা নয়। বরং এরা বাদামী এবং ঈষৎ কৃষ্ণ বর্ণের। তবে এদের কেউ কেউ গায়ে লাল রঙ মাখত; বিশেষত: যুদ্ধে যাওয়ার প্রাক্কালে সমরসজ্জার অংশ হিসেবে তারা মুখমণ্ডলে ও গায়ে লাল রঙ ব্যবহার করত। সেই থেকে রেড ইন্ডিয়ান, রেড ম্যান কিংবা রেড স্কিন - অর্থাৎ লাল চামড়ার লোক বলে এরা পরিচিত হযে ওঠে। ইদানিং এদেরকে আমেরিকান ইন্ডিয়ান বলে অভিহিত করা হয়।

বহু গোত্র, এক জাতি:
ছোট-বড় অনেক গোত্র এবং উপগোত্রে বিভক্ত ছিল রেড ইন্ডিয়ানরা। গোত্রের সবচেয়ে বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান এবং শ্রদ্ধেয় ব্যাক্তিটি হতেন গোত্রপতি। এবং অবধারিতভাবে তার ঘাড়েই তখন বর্তাতো গোত্রের যাবতীয় দায়িত্ব।

গোত্রপতির বেশভূষা হতো দেখার মতো। ঘাড়অব্দি লম্বা চুল রাখতেন তারা; গলায় ও কানে ঝুলাতেন ধাতব অলংকার। আর একটু ব্যাতিক্রমী ভাব আনতেই বুঝি নেজ পার্ছি গোত্রের কর্তা ব্যাক্তিটি নাকে ব্যবহার করতের এক ধরনের খাঁজকাটা কুন্তল। একেবারে পশ্চিমাঞ্চলে যারা বসবাস করত তারা ছিল সংখ্যা ও ক্ষমতার বিচারে সবচেয়ে সেরা গোত্র। নাম ছিল সিউ। এদের আরেক নাম ডাকোটারা। ভীষণ জেদি আর আত্মপ্রত্যয়ী এই সিউরা বসত গেড়েছিল মিনেসোটার অরণ্যভূমিতে। আর নাছোড়বান্দা যোদ্ধা হিসেবে খ্যাত আপাচিরা বাস করত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। সুদীর্ঘ আড়াই শ’টি বছর এরা লড়াই করেছে স্পেনীয় শেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে।

‘আগ্রাসন প্রিয়’ বলে বিশেষ নাম ডাক ছিল উতেরা গোত্রের। প্রায়শই এরা আক্রমন চালাত দক্ষিণের শান্তিপ্রিয় প্রতিবেশিদের ওপর। এদের বদ্ধমূল ধারণা ছিল শেতাঙ্গরা তাদের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী। তাই শেতাঙ্গদের ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবে এরা অন্যান্য গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত। এদের আবাসভূমি ছিল দেশের উত্তরে রকি পার্বত্য অঞ্চলে।

সুদূর পশ্চিমের গোত্রগুলো ছিল খুবই ছোট ছোট এবং বহুধাবিভক্ত। কোনোরূপ প্রতিরোধ গড়ে তোলার পক্ষেও ছিল নিরতিশয় দুর্বল। তবু আপন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এরাও সংগ্রাম করেছিল বছরের পর বছর ধরে।

যাপিত জীবন:
জীবনযাপনে জটিলতা ছিল না; ছিল স্বপ্রণোদিত পরিশ্রমী মানসিকতা। দিগন্ত বিস্তৃত ঘেসো জমিতে এরা চড়াত ছাগল, ঘোড়া আর ভেড়ার পাল। আর চাষযোগ্য জমিতে ফলাত ভুট্টা, গম, ফলমূল, তরমুজ ইত্যাদি। মাঝে মাঝে গভীর অরণ্য থেকে  শিকার করে আনত বুনো মোষ, হরিণ ও ভল্লুক। সেসবের মাংশ রোদে শুকিয়ে বা আগুনে ঝলসে দিব্যি চলত ভুড়িভোজ। আর শিকারকৃত পশুর চামড়া দিয়ে বানাত পায়ের জুতো, হাতের দস্তানা ও কানটুপি। বেশ বৈচিত্রপূর্ণ ছিল কোনো কোনো গোত্রের খাদ্যাভ্যাস। যেমন আপাচি গোত্রের কথাই ধরা যাক। প্রধান খাদ্য মেসকাল; তৈরি হয় ‘আভাগ’ নামের এক প্রকার গুল্মের শুকনো পাতা থেকে। মাটির হাঁড়িতে এ আভাগ পাতা সিদ্ধ করলে তা থেকে তৈরি হয় মিষ্টি, সুস্বাদু ও পুষ্টিকর মেসকাল।

জ্বালানীর কোনে সমস্যা ছিল না। কারণ বিস্তির্ণ বনভূমিজুড়ে ছিল কটন উড ও বক্সএন্ডার গাছের বিপুল সমারোহ। তবে রেড ইন্ডিয়ানরা বিশেষভাবে গর্বিত ছিল তাদের রসালো পিচ বাগিচার জন্য।

সংস্কৃতি:
গোত্রে গোত্রে চলত সাংস্কুতিক উৎসব। বছরান্তে টোটেনরা মেতে উঠত ‘সূর্য্য নাচ’ উৎসবে। এটা তাদের বাৎসরিক ধর্মীয় পুণর্মীলনী উৎসব। আর সিউরা পালন করত প্রেতনৃত্য। নেচে গেয়ে এসব অনুষ্ঠানে ঈশ্বরের স্তুতি বর্ণনা করা হতো আর তার নিকট প্রার্থনা করা হতো কৃপা। আবার চেইনীরা পালন করত ভিন্নধর্মী এক অনুষ্ঠান যার নাম মেডিসিন অ্যারো। মেডিসিন অ্যারোর দিন নেকড়ের চামড়ায় তৈরি ব্যাগ থেকে চারটি গুপ্ত তীর মেলে ধরেন কোনো একজন তীর রক্ষক। আর গোত্রের সকল পুরুষ একে একে তীরগুলোর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অর্ঘ্য নিবেদন করে এবং প্রার্থনা জানায় তীরগুলোর কাছে।

ধর্ম বিশ্বাস:
ধর্ম বিশ্বাসের পারদটা অবশ্য উচুতেই ছিল রেড ইন্ডিয়ানদের। সর্বজনীন কনো ধর্ম না থাকলেও গোত্র ভেদে আলাদা আলাদা ধর্মাচার বেশ নিষ্ঠার সাথেই পালিত হতো। তবে একটা বিষয়ে সব গোত্রই ছিল ঐক্যমত। সেটা ব্ল্যাক হিলস। ব্ল্যাক হিলসকে প্রত্যেক ইন্ডিয়ানই মনে করত পবিত্রতম স্থান। তাদের ধারনা, পৃথিবীর কেন্দ্রীয় ভূমি এই ব্ল্যাক হিলস (অন্য নাম পাহাসাপাতে) এবং তারা বিশ্বাসও করত পৃথিবীর বেষ্টনীটা এখান থেকেই শুরু হয়ে বৃত্তাকারে চলে গেছে। প্রতি বছর গ্রীষ্মকালে ইন্ডিয়ানদের প্রায় সকল গোত্র এই পবিত্র ভূমিতে জড়ো হতো। তারা মনে করত, গ্রীষ্মকাল গ্রেট স্পিরিটের সঙ্গে (ঈশ্বর) সংযোগ স্থাপনের কাল, তার কৃপা প্রার্থনা ও সুদৃষ্টি লাভের কাল। যোদ্ধারা এখানে আসত ঈশ্বরের সাথে কথা বলতে।

লড়াই সংগ্রামে চারশ বছর:
সেই যে ১৪৯২ খ্রীস্টাব্দে কলম্বাস খুঁজে বের করলেন আমেরিকা, তারপর থেকে নানা জাতের ইউরোপীয় শেতাঙ্গরা দলে দলে পাড়ি জমাতে শুরু করে নব্য আবিষ্কৃত ওই ভূখণ্ডে। শুরু হয় কলোনাইজেশন তথা বসতিস্থাপন, জবরদখল, হত্যা ও লুণ্ঠন। আপন অস্তিত্ব বাঁচাতে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে রেড ইন্ডিয়ানরা। তবু শেষ রক্ষা হয় না। একে একে ব্যর্থ হয়ে যায় তাদের আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধের যাবতীয় প্রচেষ্টা; যার আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটে ‘উ্যনডেড নি’ এক পার্বত্য খাড়ির বাঁকে। খ্রীষ্টিয় পঞ্জিকা মতে, দিনটি ছিল ১৮৯০ সালের ২৯ ডিসেম্বর।

দ্বীপ নিভে নাই:
১৪৯২ থেকে ১৮৯০ - সুদীর্ঘ চারশ বছরের ইতিহাস রেড ইন্ডিয়ানদের লড়াই সংগ্রামের ইতিহাস। এই ইতিহাস বুকে ধারণ করে যে মুষ্টিমেয় আদিবাসী নতুন প্রজন্ম আজও বেঁচে আছে তারা অবশ্য ক্রমেই নিজেদেরকে সুশিক্ষিত করে তুলছে। ইতিমধ্যেই তারা আয়ত্বে এনেছে আইন, অর্থনীতি ও রাজনীতির বহুমুখী কলাকৌশল। তারা স্বাক্ষর রাখছে শিল্পকলা ও বিজ্ঞান থেকে আরম্ভ করে ইতিহাস, সমকালীন ঘটনাপ্রবাহ, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ও কবিতার মতো বৈচিত্রভরা ক্ষেত্রে।

তবু হতাশা কাটেনি পুরোপুরি। গৃহায়ণ ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে আমেরিকান এ আদিবাসীদের সুবিপুল অংশেরই অবস্থা আজও নিদারুণ উদ্বেগজনক। অসংখ্য অন্যায় অবিচার আজও ডুকরে মরছে প্রতিকারের আশায়।

-
তথ্যসূত্র: Bury My Heart at Wounded Knee – by Dee Brown, তথ্যকোষ, একাধিক ওয়েবসাইট


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

Columbus, Red, Indian, West, Indies, America, History, Wounded, Knee