সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

the-elephant-year-abraha.jpg

ইতিহাসের পাতা থেকে ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয় - দ্বিতীয় পর্ব

আর তখন তখনই কা’বা ঘরের মালিক, আল্লাহর নির্দেশে সমুদ্রের উপর দিয়ে হাজার হাজার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আবাবিল পাখী ঝাঁকে ঝাঁকে আসতে থাকে! তাদের প্রত্যেকের ঠোঁটে একটি এবং দু’পায়ের নখের মাঝে দু’টি, মোট তিনটি করে কাদামাটি আর পাথর বহন করে নিয়ে এসে আবরাহার বাহিনীর উপর বর্ষণ করতে থাকে!

৫৭০ খ্রীষ্টাব্দ! ষাট হাজার পদাতিক সৈন্য আর তেরটি হাতীর সমন্বয়ে গঠিত এক বিশাল সেনা বাহিনী নিয়ে ইয়েমেন থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে যান মহাদাম্ভিক আবরাহা! তিনি আল্লাহর ঘর কা’বা শরিফ ধ্বংস করবেন! এই কা’বা ঘর ধ্বংস হয়ে গেলেই আরববাসীসহ মানুষজন দলে দলে তার নির্মিত বিশ্বশ্রেষ্ঠ চার্চ, যাকে আবরাহা মক্কার কা’বা ঘরের চাইতে দশ নয় একশত গুন চমৎকার করে নির্মাণ করেছেন বলে দাবী করেছিলেন। সেই চমৎকার নিদর্শণকে কেন্দ্র করে এবার বিশ্ব মানব সমবেত হবে ইয়েমেনের সানা’য়! আর তিনি হবেন তার পুরোহিত! ঈষৎ আনন্দের ঝিলিক যেন বয়ে যায় উচ্চাভিলাসী বিকৃত রুচির একজন অর্বাচীনের মনে।

আবরাহার অপকৌশল আপাততঃ সফল হয়! নাজ্জাশী আবরাহার যুদ্ধ পরিকল্পনা সমর্থন করে যুদ্ধাভিযানের সকল আয়োজনে সাহায্য সহযোগিতা করতে থাকেন। তার মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষনীয় বিষয় হ’লো, নাজ্জাশী এবং আবরাহার প্রিয় ও আস্থাভাজন হাতী 'মাহমুদ' এর নেতৃত্বে তেরটি হাতীর বহর অভিযানে যুক্ত করা! মাহমুদ হাতীটি এমন এক হাতী, যার সামনে অন্যান্য হাতী গুলো সব সময় জড়সড় হয়েই থাকতো, কোন অবস্থাতেই তারা মাহমুদ এর ইচ্ছার বাইরে কোন কিছু করার ইচ্ছাই পোষণ করতো না। ইবনে ইসহাকের মতে, আবরাহার বাহিনীতে মাহমুদ নামক একটি হাতীসহ তের থেকে এক হাজার সংখ্যক হাতী এবং বিশাল সেনা বাহিনী নিয়ে মক্কার পথে আরবের প্রতিটি উপজাতিকে পরাস্ত করতে করতে এগোতে থাকে।

আবরাহা তখন ইয়েমেনের গভর্নর, যা ছিল নাজ্জাশী শাসিত ইখিওপিয়ারই অংশ। তাই তার অহংকার ও ছিল আকাশচুম্বি! রাজকীয় সেই অভিযান ছিল আনন্দমুখর, কারণ আবরাহার পূর্ব থেকেই বিশ্বাস ছিল যে, তাকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা মক্কাবাসীর নেই। তবুও পথে পথে বিভিন্ন উপজাতির বাধার সন্মুখীন তাকে হতে হয়েছিল, যদিও সে বাধা অতিক্রম করা তার জন্য কঠিন হয় নাই। আবরাহা যখন হেযায অঞ্চলে প্রবেশ করেন তখন বহু যুদ্ধের অভিজ্ঞতালব্ধ Dhu Nafr, যিনি আব্দুল মুত্তালিবের ঘনিষ্ঠ জন, তিনি বার হাজার সৈন্যের একটা বাহিনী নিয়ে আবরাহার বাহিনীকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু পরাজিত হয়ে বন্দীত্ব বরণ করেন। Bani Kath’am গোত্রের নেতা Nafayl bin Habib, তিনিও এক হাজার সৈন্যের বহর নিয়ে আবরাহাকে প্রতিরোধ করতে গিয়ে পরাজিত হন এবং ভবিষ্যতে তাকে সহযোগিতা করার শর্তে প্রাণে বেঁচে যান এবং বন্দীত্ব বরণ করেন।

কিন্তু পথিমধ্যে Bani Thaqif গোত্রের নেতা Mas’ud bin Mu’attib আবরাহাকে বিভিন্ন রকম উপহার সামগ্রীসহ স্বাগত জানান এবং আবরাহার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নিয়ে তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। তার গোত্রেরই Abu Righal নামক একজন ব্যক্তিকে আবরাহার পথ প্রদর্শক হিসাবে কাজ করার জন্য তার সঙ্গে প্রেরণ করেন। তার দেখিয়ে দেয়া পথ বেয়েই আবরাহার বাহিনী মক্কার উপকন্ঠ Mughammas পর্যন্ত পৌঁছে গিয়ে সেখানে ঘাঁটি গেড়ে বসেন। কিন্তু সেখানেই Abu Righal মৃত্যু বরণ করলে ঐখানেই তাকে কবরস্থ করা হয়, যে কবরের পাশ দিয়ে যাবার সময় এখনও আরববাসী ঘৃণা ভরে তার প্রতি পাথর নিক্ষেপ করে থাকে, যে কারণে তার কবরের উপর জমে গেছে বিশাল পাথরের স্তুপ।

এমতাবস্থায় মক্কাবাসীগণ তাদের নেতা আব্দুল মুত্তালিব, যিনি ছিলেন মহানবী (সাঃ) এর পিতামহ এবং আরবের কুরাইশ ও কিনানা গোত্রের প্রধান, সেই সাথে কা’বা ঘরের তত্বাবধায়কও, তাঁর নিকট তাদের করনীয় সম্পর্কে জানতে গেলে তিনি তাদের সবাইকে পরিবার পরিজন ও আত্মীয় স্বজন সহ সবাইকে নিয়ে মক্কার চারপাশে পর্বতে আশ্রয় নেবার পরামর্শ দিয়ে বললেন, কা’বা হচ্ছে আল্লাহর ঘর, অতএব তাকে আমরা আল্লাহর হাওলায় ছেড়ে দেই, কারণ তিনি আমাদের চাইতে অনেক শক্তিশালী, তিনি যদি চান, শত্রুর হাতে ছেড়ে দিবেন অথবা চাইলে রক্ষা করবেন। এটা তার নিজস্ব ব্যাপার। তিনি যেটা ভাল মনে করবেন সেটাই হবে। 

ইতোমধ্যে আবরাহা 'আসওয়াড বিন মাফসুদ'র নেতৃত্বে ৫০০০ সৈন্যের একটা বাহিনীকে মক্কার অভ্যন্তরে প্রবেশ না করে তার আশপাশ থেকে আরব বাসীর ছাগল, ভেড়া, উট, ঘোড়া সহ তাদের পালকদের ধরে আনার নির্দেশ দিলেন। রাখালগণ আবরাহার প্রশ্নের জবাবে জানাল, তাদের নেতা মক্কায় রক্তপাতের পক্ষপাতী নন, তিনি কা’বা ঘরের মালিকের হাওলায় তার ঘরকে সপে দিয়ে সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাবার উপদেশ দিয়েছেন।

এবার আবরাহার পালা। ইয়েমেনের Hunata নামীয় একজন প্রভাবশালী সৈন্যকে তিনি মক্কার লোকদের কাছে পাঠালেন এ কথা বলার জন্য যে, তিনি কা’বা ঘর ধ্বংশের ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এবং এ কাজটি করার জন্যেই তিনি এসেছেন। আর তিনিও মক্কায় রক্তপাতের পক্ষপাতী নন, তবে মক্কার নেতার সঙ্গে তিনি কথা বলতে চান। আব্দুল মুত্তালিব আবরাহার সঙ্গে কথা বলার জন্য তার ডেড়ায় গেলেন এবং বন্দীদের সঙ্গে একটি রাত কাটালেন। বন্দীদের মাধ্যমে আবরাহা আব্দুল মুত্তালিব সম্পর্কে অনেক প্রশংসা বাক্য শুনে এবং পরদিন সকালে যখন তিনি তার দরবারে উপস্থিত হলেন তখন তাঁর সুশ্রী ও ব্যক্ত্বিত্ব সম্পন্ন চেহারায় অভিভূত হয়ে সিংহাসন ছেড়ে কার্পেটে পাশাপাশি বসে কথা বলা শুরু করলেন। এবার আবরাহা আব্দুল মুত্তালিবের কাছে জানতে চাইলেন, তিনি কী চান? উত্তরে তিনি খুব সহজ এবং স্বাভাবিক ভাবেই বললেন, আপনার সেনা বাহিনীর লোকজন আমার দুইশত উট ধরে এনেছে, আমি সে গুলোই ফেরৎ চাই।

বিস্ময়ে হতবাক আবরাহা যেন আকাশ থেকে পড়লেন! এই কী কা’বা ঘরের তত্বাবধায়কের কথা! তিনি ভেবেছিলেন, কা’বা ঘরের তত্বাবধায়ক কা’বা ঘর রক্ষার আবেদনে পেরেশান হবেন, আর তিনি তাঁর সম্মানে কা’বা ঘর ধ্বংস না করে মহৎ হবার সুযোগ পাবেন! অথচ তিনি তার নিজের দুইশত উট ফেরৎ পাওয়ার জন্য কথা বলছেন! আসলে ব্যাপারটার সঙ্গে তার ধারণা উল্টো হয়ে গেল! তারপরেও কৌতুহল দমাতে না পেরে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনি তো কা’বা ঘরের তত্বাবধায়ক, তাহলে কা’বা ঘরের সুরক্ষার ব্যাপারে আপনার কোন পেরেশানী নেই কেন? উত্তরে আব্দুল মুত্তালিব বললেন, দেখুন, আমি তো এই ঘরের মালিক নই, এই ঘরের একজন মালিক আছেন, তিনি জানেন তার ঘরকে কিভাবে পাহাড়া দিতে হবে বা কিভাবে সুরক্ষা করতে হবে। আমার প্রতিরোধ করার প্রয়োজন নেই। তিনি যদি চান রক্ষা করবেন আর যদি চান, ধ্বংস করতে দেবেন । এটা আমার ভাববার বিষয় নয়। ফলে আবরাহার সামনে আর বিকল্প কোন ব্যবস্থা থাকলো না। তিনি তার সৈন্যদেরকে মক্কা প্রধানের উটগুলো ছেড়ে দেবার নির্দেশ দিয়ে নিজের কাজে মনোনিবেশ করলেন।

পরদিন সকালেই আবরাহার নির্দেশে মূল পর্বের কাজ শুরূ হয়ে গেল। মক্কায় ঢোকার মুখে তবু আবরাহা আরেকবার নিশ্চিত হতে চাইলেন, তাই মিনায় বিরতি দিয়ে মক্কা শহরের ভেতরের খবর নেবার হুকুম দিলেন। মক্কা নগরী এখন একেবারে ফাঁকা, একটা পরিত্যাক্ত নগরী মাত্র! এবার সামনে থাকা হাতী মাহমুদকে অগ্রসর হবার নির্দেশ দিতেই সে মক্কার সীমানায় পৌঁছেই আর সামনে এগোতে অপারগতা প্রকাশ করলো, বসে পড়ার মধ্যে দিয়ে! ফলে তার অনুসারী অন্যান্য হাতীও তাকেই অনুসরণ করতে বাধ্য হ’লো! এ রহস্যের ভেদ না বুঝে সৈন্যরা মাহমুদ'র মাথায় হাতুরীর আঘাত আর পেটে হুক দিয়ে আঘাত করে করেও যখন তাকে টলাতে পারল না তখন তার মুখটাকে অন্য দিকে ঘোরাবার চেষ্টা করতেই মাহমুদ উঠে স্থান ত্যাগ করলো। 

আর তখন তখনই কা’বা ঘরের মালিক, আল্লাহর নির্দেশে সমুদ্রের উপর দিয়ে হাজার হাজার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আবাবিল পাখী ঝাঁকে ঝাঁকে আসতে থাকে! তাদের প্রত্যেকের ঠোঁটে একটি এবং দু’পায়ের নখের মাঝে দু’টি, মোট তিনটি করে কাদামাটি আর পাথর বহন করে নিয়ে এসে আবরাহার বাহিনীর উপর বর্ষণ করতে থাকে! আঘাতপ্রাপ্ত সৈন্যরা প্রথমে ফুলে ফেঁপে উঠল তারপর বিস্ফোরিত হয়ে ধ্বংশ হতে থাকল! বাকীরা পালিয়ে জীবন বাঁচাবার চেষ্টা করতে থাকল! এমনি করেই এক সময় বিশ্ব শ্রেষ্ঠ চার্চের নির্মাতা, নাজ্জাশী আর বাইজেন্টাইন সম্রাটের  আশীর্বাদপুষ্ট  ইয়েমেন সম্রাট, যিনি ক্ষমতার সিড়ি বেয়ে বেয়ে  নিজেকে ক্ষমতার শিরোমণি ভাবতে শুরু করেছিলেন, সেই জেনারেল আবরাহা কত অসহায়ভাবে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সমুলে ধ্বংস হয়ে জগৎবাসীর জন্য একটা দৃষ্টান্ত রেখে গেলেন ! এখানেই শেষ হয়ে গেল তার ক্ষমতার দম্ভ!

এই ৫৭০ খ্রীষ্টাব্দেই আল্লাহর বন্ধু সর্বশেষ মহানবী হযরত মুহম্মদ (সাঃ) মক্কার জমিনে জন্মগ্রহণ করে পৃথিবীর মানুষের জন্য রহমতের বার্তা বয়ে নিয়ে এলেন।


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

Elephant, Religious, Pilgrims, Attack, Empire, Abraha, Mecca, History