সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

soisob 1.jpg

প্রজন্ম একটি স্মার্টফোন ও শৈশবের অপমৃত্যু

ছোট ছোট ছেলে মেয়েগুলোকে দেখলে কষ্ট লাগে। নতুন বইয়ের ঘ্রাণ কি অপূর্ব বেচারারা তা জানে না। দিনের পর দিন হেঁটে টাকা জমিয়ে বই কেনার আনন্দ ওরা কখনো পায়নি। সম্পূর্ণ অপরিচিত আঙ্কেল টম কিংবা হোয়াইট ফ্যাঙ এর জন্য মন খারাপ করতে করতে যে মানুষটার জন্ম হয় ওরা সেই মানুষটা হতে পারছে না

যে সময়ের কথা বলছি সে ছিলো এক অন্যরকম সময়। কি যেনো এক অস্থিরতায় কিছুতেই স্বস্তি পেতাম না। তখন আমাদের নায়ক ছিলো ফেলুদা, শার্লোক হোমস, টেনিদা, কাকাবাবু, কিশোর, মুসা, রবিন, হাকলবেরি ফিন, টম সয়্যার আরো কতো কে। আজ এর প্রেমে পড়ি তো কাল ওর। কোনদিন নিজেকে মনে হতো কিশোর পাশা আবার কোনদিন হয়ে যেতাম দু:সাহসী টম সয়্যার। অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় ছিলাম পাগল। গুপ্তধনের নেশায় শেষটায় একদিন বন্ধু ফয়সালকে নিয়ে কুমিল্লা জিলা স্কুলের ম্যাপই তৈরী করে ফেললাম। গুপ্তধন পেতে হলে ম্যাপতো লাগেই...

সে সময়ে অ্যাডভেঞ্চারের পাশাপাশি আমরা সত্যিকারের মানবিক হয়ে উঠছিলাম। আঙ্কেল টমের দুঃখ আমাদের ঘুমাতে দিতো না। হোয়াইট ফ্যাঙ পড়ার পর আমি বাসায় কুকুর পোষা শুরু করেছিলাম। উভচর মানুষ পড়ে দুইদিন এত বিষন্ন ছিলাম যে শেষে বাসার মাস্টারমশাই আম্মুকে ডেকে বললেন ছেলের মতিগতি ভালো ঠেকছে না, খোঁজ নেন প্রেমে টেমে পড়লো কিনা।

তো সেসময়ে আমরা ছিলাম নিতান্তই বোকাসোকা মানুষ। আনস্মার্টও বটে। দিনের পর দিন দুটো শার্ট ধুয়ে ধুয়ে পড়ে কাটিয়ে দিতাম। বছরে কাপড় পেতাম এক ঈদে। বিলাসিতা বলতে ছিলো শুধু বই কেনা। তবে সেই বই কেনার জন্য কোন আলাদা বাজেট থাকতো না। আয়ের প্রধান উৎস ছিলো স্কুলের রিক্সা ভাড়া। একদিন হাটলেই ৫ টাকা রোজগার হয়ে যেতো। আর টানা সপ্তাহখানেক হাটতে পারলে একটা বই কিনতে পারতাম। আয়ের আরেকটা অপ্রধান উৎস ছিলো স্কুলের টিফিনের টাকা। অপ্রধান কারন বিশেষ বিশেষ মুহূর্তেই সেটা পেতাম। এক সপ্তাহ হাটাহাটি করে যখন বইটা কিনে নাকের কাছে নিয়ে পাতা গুলোর ঘ্রাণ শুকতাম তখন মনে হতো আমিই পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।

অনেক লম্বা ভূমিকা দিলাম এবার আসল কথায় আসি। আমারা ধীরে ধীরে একটা অস্বাভাবিক প্রজন্ম তৈরী করছি। যে প্রজন্মের হাতে আছে একটা স্মার্টফোন। তার আর কিছুই নেই। তার কোন স্বপ্নের নায়ক নেই, কোন স্বপ্ন নেই, কারও জন্য কোন অনুভুতি অবশিষ্ট নেই। তার আছে স্মার্টফোন আর সে নিজে। তার যাবতীয় চিন্তা চেতনা নিজেকে ঘিরে আর সেই চেতনার হাতিয়ার হচ্ছে তার হাতের স্মার্টফোন। সে নিজেকে খুজে পায় সেলফিতে। সুখ গুলো মেপে নেয় কমেন্ট সংখ্যায়। ফেলুদার সাথে তাদের পরিচয় নেই। কিশোর, মুসা তাদের বন্ধু নয়। আঙ্কেল টমের জন্য তাদের নির্ঘুম রাত কাটাতে হয় না। কারন রাত কাটানোর জন্য তার আছে স্মার্টফোন আর ফেসবুক।

ছোট ছোট ছেলে মেয়েগুলোকে দেখলে কষ্ট লাগে। নতুন বইয়ের ঘ্রাণ কি অপূর্ব বেচারারা তা জানে না। দিনের পর দিন হেঁটে টাকা জমিয়ে বই কেনার আনন্দ ওরা কখনো পায়নি। সম্পূর্ণ অপরিচিত আঙ্কেল টম কিংবা হোয়াইট ফ্যাঙ এর জন্য মন খারাপ করতে করতে যে মানুষটার জন্ম হয় ওরা সেই মানুষটা হতে পারছে না।

টীকা:
আঙ্কেল টম: হ্যারিয়েট বিচার স্টো’র বিখ্যাত কিশোর উপন্যাস 'আঙ্কল টমস্‌ কেবিন' এর প্রধান চরিত্র।
হোয়াইট ফ্যাঙ: জ্যাক লন্ডনের কালজয়ী উপন্যাস। ছোট একটি কুকুরের বাচ্চার কাহিনী নিয়ে রচিত।
উভচর মানুষ: আলেক্সান্দর বেলায়েভের বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী।


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

childhood, story, book, tiffin, Heroes, study, classic, smartphone, no-life