সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

MD Sobur Ali FF1.jpg

যুদ্ধের স্মৃতি একটি অসত্য তথ্যে বেঁচে গিয়েছিলেন ১৫ মুক্তিযোদ্ধা

অতি সন্তর্পনে পাওয়ার স্টেশনে ঢুকে ডিনামাইট স্থাপন করে ওই রুমে থাকা দুই জন পাহাদারকে বেরিয়ে যেতে বলে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বিদ্যুত ব্যাবস্থায় বিঘ্ন ঘটাতে সক্ষম হই।

‘জুন, ১৯৭১। বেলা প্রায় ৩টা। সংবাদ এলো এলাকার রাজাকারেরা আমাদের থানা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের বাড়িতে আগুন দিয়েছে। কমান্ডারের বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে ব্যাপক নির্যাতন করেছে। এমন সংবাদে মাথায় রক্ত উঠে গেল। ওই দিন কমান্ডার ওলাদ হোসেনসহ আমরা ১৫ মুক্তিযোদ্ধা এক সাথে ছিলাম।

দাবী করলাম, রাজাকার নিধনে এখনই অভিযান চালাতে হবে। কমান্ডার রাজি হলেন। পোষাক পরে অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঝটপট কমান্ডারের বাড়ি  মান্দার বাড়িয়া গ্রামের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম। মুক্তিযোদ্ধা মোঃ সবুর আলী তেজদীপ্ত কন্ঠে বলে চললেন, প্রায় ৩কি.মি.পথ পাড়ি দিয়ে যখন ইনেতপুর গ্রাম থেকে পশ্বিমে নরদেহী গ্রামে পৌঁছালাম তখন ঘটিতে ৪টা বাঁজে।

আমাদের দেখে গায়ে গামছা জড়ানো এক ব্যক্তি দৌঁড়ে কাছে আসলেন এবং হাঁপাতে হাঁপাতে জানতে চাইলেন, ইনেতপুর কিংবা চাঁপাতলা গ্রামে আমাদের কোন মুক্তিযোদ্ধা আছে কিনা? আমরা সবাই চলে এসেছি জানতে পেরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে ওই ব্যক্তি জানালেন, ইনেতপুর ও চাঁপাতলা গ্রামে পাকিস্থানী আর্মিরা মুক্তিযোদ্ধাদের তন্ন তন্ন করে খুঁজছে। সেই দিন তড়িঘড়ি বের হয়ে না আসলে নিশ্চিত মারা পড়তাম। এভাবেই যুদ্ধের গল্প শুরু করেন মুক্তিযোদ্ধা মোঃ সবুর আলী। 

ইনেতপুর  গ্রামে অবস্থান করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলে চললেন, সে সময় কালীগঞ্জের পিরোজপুর গ্রামের রাস্তা দিয়ে সোজা পশ্বিমের পথ ধরে প্রতিনিয়ত শরণার্থীরা ভারতের উদ্দেশ্যে যেত। এই পথেই ঝিনাইদহের বারবাজার ইউপি ভবনের রাজাকার ক্যাম্পের রাজাকারেরা শরণার্থীদের অর্থকড়ি ও মালামাল লুন্ঠন করতো।

রাজকারদের শায়েস্তা করতে জুন মাসের কোন এক দিন ভোররাতে ইনেতপুর গ্রামে কমান্ডারসহ আমরা ১৫জন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের পিরোজপুর গ্রামের ওই রাস্তার এক পাশে এ্যামবুশ(প্রস্তুতি নিয়ে) করে ছিলাম। কিন্তু ওই দিন রাজাকারেরা আসেনি। দিনের বেলা আমরা পিরোজপুরের পাশের গ্রাম ইনেতপুরে থাকার সিদ্ধান্ত নিই।

দুপুরে খাওয়া-দাওয়া শেষে মসলেম মেম্বরের বাড়িতে বিশ্রামের প্রস্ততি নিচ্ছিলাম। এমন সময় কমান্ডারের বাড়িতে আগুন দেয়ার সংবাদে বেলা ৩টার দিকে আমরা বেরিয়ে পড়ি। নরদেহী গ্রাম পেরিয়ে বহিরগাছী গ্রামে এসে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, মান্দারবাড়িয়া গ্রামে কমান্ডারের বাড়িতে কেউ আগুন দেয়নি, কেউ তার বাবা-মাকেও নির্যাতন করেনি। সেদিনকার ওই অসত্য তথ্যে ঝটপট ওই গ্রাম থেকে বেরিয়ে পড়ায় থানা কমান্ডারসহ আমরা ১৫  মুক্তিযোদ্ধা প্রাণে বেঁচে যাই। 

পরিচয়ঃ
বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ সবুর আলী (বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত, মে ২১,২০০৫ ক্রমিক নং ৬৮৩) তৎকালীন কালীগঞ্জ থানার জগদীশপুর(চৌগাছা উপজেরার অর্ন্তগত) গ্রামের মৃত খায়রুল হক বিশ্বাসের ছেলে। বর্তমানে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা শহরের ঢাকালে পাড়াতে বসবাস করছেন।

যেভাবে মুক্তি যুদ্ধে যাওয়াঃ
মুক্তিযুদ্ধের সময় মান্দার বাড়িয়া গ্রামের ইসমাইল বিশ্বাসের বাড়িতে লজিং থেকে এস এস সি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ২৬ মার্চ যশোর এম এম কলেজ পড়–য়া সোহরাব নামের এক বড় ভাই তাকে পড়তে দেখে বলেন,পড়াশুনা বাদ দাও। পাকিস্থানীদের সাথে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। চলো যুদ্ধে যোগ দেই।

বড় ভাই সোহরাবের কথা মতো ২৬মার্চ ১৯৭১ একটি বিকো বাইসাইকেলে চড়ে দুই জন ভারতের বনগাঁয়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিই। সব ঠিকঠাক করে ফিরে এক দিন পরে বাড়িতে ফিরে আসি। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে আমি ও সোহরাবসহ ৪/৫জন ট্রেনিংয়ের উদ্দেশ্যে ভারতের বনগাঁয়ে যাই।

সেখানে রিক্রুট ক্যাম্পে ১মাস প্রশিক্ষণ শেষে হায়ার ট্রেনিংয়ের জন্য বিহারের চাকুলিয়া পরিত্যাক্ত এক সেনানিবাসে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ১মাস ট্রেনিং শেষে পূণরায় বনগাঁয়ের প্যাট্রোপোল ক্যাম্পে আনা হয়।

সেখান থেকে সীমান্তবর্তী এলাকায় অপারেশনের জন্য আমাদের পাঠানো হতো । তিনি বলেন, কয়েকটি অপারেশন সফল করতে পারায় আমাদের ১০/১২জনের একটি গ্রুপকে অস্ত্র-শস্ত্র ও গোলাবারুদ দিয়ে নিজ এলাকায় অভিযান পরিচালনার জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয়।

দেশে ফিরে গেরিলা বাহিনী গঠন ও অভিযানঃ
এলাকায় এসে কালীগঞ্জ থানা কমান্ডার ওলাদ হোসেনের নির্দেশে আমার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা ইসহাক, আব্দুল বারি, নুরমোহাম্মদ ভুট্টিসহ আরো কয়েকজনকে  নিয়ে একটি ছোট গেরিলা বাহিনী গড়ে তুলি। আমরা রাজাকারদের উপর হামলাসহ বিভিন্ন সময় বিদ্যুতের ট্রান্সমিটার, রেলক্রসিং, টেলিফোনের খাম্বাসহ বিভিন্ন স্থাপনা ডিনামাইট বিস্ফোরণে ধ্বংস করে দেয়ার কাজ করতাম। 

মুক্তিযোদ্ধা সবুর জানান, মোবারকগঞ্জ সুগার মিলে পাকিস্থানী সেনাবাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্প ছিল। এ ক্যাম্প থেকে তারা কালীগঞ্জের বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযান চালাতো। কমান্ডের নির্দেশে জুলাই মাসের শেষের দিকে আমাদের ওই ১৪/১৫জনের গেরিলা বাহিনীকে মিলের পাওয়ার স্টেশন উড়িয়ে দেয়ার দায়িত্ব দেয়া হলো।

একদিন রাতে সুগার মিলের দক্ষিণের প্রবেশ পথের পাশে কয়েকজন সদস্যকে এ্যামবুশ অবস্থায় রেখে আমি ও আরেকজন যোদ্ধা অতি সন্তর্পনে পাওয়ার স্টেশনে ঢুকে ডিনামাইট স্থাপন করে ওই রুমে থাকা দুই জন পাহাদারকে বেরিয়ে যেতে বলে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বিদ্যুত ব্যাবস্থায় বিঘ্ন ঘটাতে সক্ষম হই।  

তিনি আরো বলেন, ১৯৭১ সালের ১৪ আগষ্ট পাকিস্থানের স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে পাক সেনাবাহিনীর মধ্যে বেশ  তোড় জোড় চলছিল। ঝিনাইদহ অঞ্চলে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন নস্যাৎ করে দেয়ার লক্ষে আমার নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধা ১৩ আগষ্ট রাতে কালীগঞ্জ উপজেলার বুজিডাঙ্গা এলাকার বোয়ালিয়া ব্রিজ ডিনামাইট বিস্ফোরণে উড়িয়ে দিই।

কষ্টের স্মৃতিঃ
এক পর্যায়ে একটি মর্মান্তিক ঘটনার কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন মুক্তিযোদ্ধা মোঃ সবুর আলী। তিনি বলেন, কালীগঞ্জ-মহেশপুর সড়কে পাক আর্মীর গতিবিধি লক্ষ করার জন্য আগষ্টের কোন এক দিনে কালীগঞ্জ উপজেলার সানবান্দা গ্রামের কালু খন্দকারের বাড়িতে আশ্রয় নেন তারা।

দুপুরের খাবার খেয়ে লাউতলায় (কালীগঞ্জ-মহেশপুর সড়ক সংলগ্ন এলাকা) যান পাক আর্মীর গতিবিধি লক্ষ করতে। লাউতলায় যাওয়ার পূর্বে ওই বাড়ির একটি কক্ষের খাটের নিচে গ্রেনেডসহ বিভিন্ন অস্ত্র বস্তা দিয়ে ঢেকে রেখে আসেন। কাজ শেষে বিকালের সময় সানবান্দা গ্রামের কালু খন্দকারের বাড়িতে ঢুকে দেখেন ওই কক্ষজুড়ে মাংশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে।

গ্রেনেড বিস্ফোরণে সব তছনছ হয়ে গেছে। তিনি বলেন,পরে জানতে পারলাম আমাদের আশ্রয়দাতা কালু খন্দকারের অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে জিন্নাত খন্দকার কৌতুহল বসতঃ খাটের নিচ থেকে গ্রেনেড বের করে গ্রেনেডের চাবি খুলে ফেলায় বিস্ফোরণ ঘটে মারা গেছে।’ কক্ষজুড়ে জিন্নাতের শরীরের মাংশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার দৃশ্যটি আজও তার স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে।   

বর্তমান থানা কমান্ডের বক্তব্যঃ
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধা মোঃ সবুরের দুঃসাহসিক  অভিযান পরিচালনার কথা স্বীকার করে কালীগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হেলাল উদ্দিন বলেন, সবুরদের মতো মুক্তিযোদ্ধা ছিল বলে  আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক।  


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

১৯৭১, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, অসত্য-অথ্য, পাকিস্তানী