সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

salvador-dali-dream.jpg

রহস্যের বেড়াজালে আবৃত স্বপ্ন নিয়ে কল্পকথা

আজকের বিজ্ঞান বিশ্ববাসীকে মুহুর্মুহু চমকিত করলেও আজাবধি স্বপ্নের রহস্য পুরোপুরি ভেদ করতে পারে নাই! নিরন্তর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে কিন্তু অগ্রগতি যৎসামান্যই! যার নির্যাস এরকমই যে, আপাততঃ ফলাফল একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে। কিছু তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ আর সেটা নিয়ে নানান আঙ্গিকে ভিন্ন অবস্থান থেকে যার যার মত করে গবেষণা চালিয়ে যাওয়া।

স্বপ্ন নিয়ে আমাদের মনে অজস্র প্রশ্ন! স্বপ্ন কী এবং কেন দেখি? স্বপ্নের বিষয়বস্তু কে নির্দ্ধারণ করে দেয়? কি ভাবে তৈরী হয় এবং কি ভাবে প্রদর্শিত হয়? এর কোনটারই কোন সদুত্তর আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানের কাছে পরিস্কার নয়! তবে কিছু কিছু তথ্য-উপাত্ত গবেষকদের হাতে এসেছে। যেমন-স্বপ্ন কারা দেখে, কেমন স্বপ্ন মানুষ দেখে থাকে, লিঙ্গ ভেদে তার ধরণ কেমন? ইত্যাদি ইত্যাদি। গবেষকগণ স্বপ্নের সংজ্ঞা ও আনুষাঙ্গিক বিষয়েও একটা অস্বচ্ছ ধারণা দেবার চেষ্টা করছে মাত্র!

স্বপ্নের রহস্য এখনও অনুদঘাটিত! এ কারণেই হয়তো আমাদের কৌতুহলও বেশী! আসলে আমরা স্বপ্ন দেখি সত্য কিন্তু তাকে কল্প কথা বা গল্পের মত ছাড়া আর কিইবা বলা যায়! যাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না! যার কোন অবয়বের স্থায়িত্ব নেই, নেই কোন বিশ্বাস যোগ্যতার প্রমাণ! এমন কী তার কোন স্থায়ী প্রভাবও নেই! তারপরও আমরা ভয় পাই, মজা পাই, হরেক রকমের অনুভূতির সৃষ্টি হয়! তার অর্থ কী হতে পারে, তার প্রভাব কার উপর কী ভাবে পড়তে পারে, এগুলো নিয়ে আশংকা করি, আশান্বিত হই, কখনও আলোচনা করি, কখনও চেপে যাই, আবার বেশীর ভাগ সময় ভুলেও যাই!

মাঝে মাঝে আমার কাছে স্বপ্নকে কার্টুন সিনেমার মত মনে হয়! আমার জানা নেই, কার্টুন সিনেমা প্রথম যারা তৈরী করেছিলেন, স্বপ্ন তাদের প্রভাবিত করেছিল কিনা! কেননা, স্বপ্ন আর কার্টুন সিনেমার বিষয় বস্তু প্রায় একই রকম এবং সৃষ্টির জন্ম লগ্ন থেকেই মানুষ স্বপ্ন দেখে আসছে। তবে গবেষকদের গবেষণালব্ধ ধারণা বলে - 'স্বপ্নের ছবি বা চিত্র গুলো আমাদের মন থেকেই তৈরী হয় বা আমাদের মনই তৈরী করে, যখন আমরা ঘুমিয়ে থাকি। স্বপ্নে দেখা বিষয় গুলো কখনও কখনও মজার, রোমান্টিক, ধকল, ভয়ানক এবং কখনও কখনও উদ্ভটও হতে পারে।'

স্বপ্ন আসলে কী? গবেষকদের কথায়, 'স্বপ্ন প্রতিটি মানুষেরই এমন একটা সার্বজনীন অভিজ্ঞতা, যা মানুষের সচেতন বৈশিষ্টের বর্ণনা দেয়'।

স্বপ্নের মত ঘটনা কেন ঘটে? আমরা কী স্বপ্ন নিয়ন্ত্রন করতে পারি? তারা কী বোঝাতে চায় বা কী অর্থ বোঝায়? আমাদের মনে ঘুমের মাঝে কেন স্বপ্নের উদ্ভব হয় তার উপরে তদন্ত ও গবেষনা সাপেক্ষে একটা তত্ত্ব ব্যখ্যা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও শেষ কথা বলার সময় এখনও অনেক দুর তবু বিজ্ঞানীগণ স্বপ্ন নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষনা চালিয়ে যাচ্ছেন যার রহস্য পুরোপুরি ভাবে এখনও উন্মোচন করা সম্ভব হয়নি। স্বপ্নের বিশ্লেষণের ব্যাপারে স্নায়ু বিজ্ঞান এবং মনঃসমীক্কণ পন্থার মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্য পার্থক্য বিদ্যমান। একজন স্নায়ু বিজ্ঞানী ঘটিত স্বপ্নের গঠণ প্রণালী নিয়ে কাজ করতে অধিক উৎসাহী, অন্যদিকে একজন মনবিজ্ঞানী স্বপ্নের অর্থ নির্ণয়ে স্বপ্ন দ্রষ্টার সঙ্গে তার অতীত কার্যাবলীর সম্পর্ক নিয়ে কাজ করে।

স্বপ্ন মানে কী? ঘুমিয়ে পড়ার পূর্ব মুহুর্তে যে বিষয়গুলো আমাদের মনের মাঝে আনাগোনা করে সে বিষয়গুলোই সাধরিণতঃ আমাদের স্বপ্নের বিষয়ে পরিণত হয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, একজন ছাত্র তার পাঠক্রম নিয়ে, কোন বন্ধু বা প্রেমিক তাদের বন্ধু বা প্রেমিকাদের নিয়ে অথবা একজন প্রোগ্রামার প্রোগ্রামিং নিয়েও স্বপ্ন দেখতে পারে। অর্থাৎ কোন ব্যক্তি ঘুমের পূর্ব পর্যন্ত সময়ে যে সমস্ত কার্যাদির সাথে সম্পৃক্ত থাকে সেইসব দৈনন্দিন কর্মকান্ডই স্বপ্নের আকারে তার অবচেতন মনে প্রভাব ফেলে বা স্বপ্নের আকারে প্রদর্শিত হয়, এ কথাগুলো ও গবেষকদেরই।

এ পর্যন্ত বিজ্ঞানী ও গবেষকগণ মানুষের সাথে আলাপ আলোচনা করে যে সমস্ত তথ্য-উপাত্ত পেয়েছেন তার উপর গবেষনা করে যে ধারণায় উপনীত হয়েছেন তা নিম্নে তুলে ধরা হ’লো।

  • স্বপ্নে দেখা ঘটনা গুলো খুব দ্রুত ঘটে যায়।
  • অনেকেই আছে, যারা স্বপ্নের বিষয়বস্তু মনে রাখতে পারে না।
  • প্রায় সবাই প্রতি রাতে ৩ থেকে ৬ বার স্বপ্ন দেখে থাকে।
  • প্রায় ৯৫% স্বপ্নই বিছানায় থাকাকালীন সময়ের মধ্যেই মানুষ ভুলে যায়।
  • প্রদর্শিত প্রায় প্রতিটি স্বপ্নই ৫ থেকে ২০ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
  • স্মৃতি শক্তি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে স্বপ্ন অনেকাংশে সাহায্য করে।
  • পরিবার, সন্তানাদি এবং গৃহসজ্জা বিষয়ে পুরুষদের চাইতে মহিলারা বেশী স্বপ্ন দেখে থাকে।
  • বিগত সপ্তাহের এমন অনেক বিষয় থাকে, যা স্বপ্নের নামে মনের উপর প্রভাব বিস্তার করে। এ অবস্থা কে 'ড্রিম-ল্যাগ-ইফেক্ট বলে'।
  • যারা স্বপ্ন দেখে তাদের ৪৮% স্বপ্নের বৈশিষ্ট সম্পর্কে ধারণা করতে পারে।
  • ঘুম এবং স্বপ্ন উভয় বিষয়ই মাদক দ্রব্য দ্বারা প্রভাবিত হয়।
  • ত্রিশ বছরের নিচে যাদের বয়স, তাদের শতকরা আশি ভাগই রঙিন স্বপ্ন দেখে আর ষাটোর্ধ ব্যক্তিগণ দেখেন মাত্র শতকরা বিশ ভাগ । বাকী সব সাদা-কালো।
  • গবেষকদের ধারণা, বিভিন্ন প্রজন্মের মাঝে যে পার্থক্য সৃষ্টি হয়, তার পিছনে রঙিন টেলিভিশন একটা বড় ভূমিকা রাখে।
  • গবেষকগণ তাদের গবেষনায় এটাও দেখেছেন যে, চক্ষুষ্মান অংশগ্রহণ কারীদের চেয়ে অন্ধগণের স্বপ্নের প্রকাশ শক্তি কম। তবে অন্ধদের স্বপ্নে শ্রাবনেন্দ্রিয়, স্পর্শ, রসনা সন্মন্ধিয় এবং ঘ্রানজ উপাদান চক্ষস্মানদের চাইতে বেশী থাকে। অবশ্য উভয় শ্রেণীর অংশগ্রহণকারীদের মাঝেই আবেগ ও বিষয়বস্তুর কোন তফাৎ নেই।
  • গবেষকগণ এমন ধারণাও পোষণ করেন যে, শরীরের গঠণ প্রণালী ও ই,ই.জি কার্যকলাপ যুক্ত হওয়ার কারণে বুড়ো মানুষের ঘুমের সময় পরিবর্তন হয়। গবেষকদের মতে বৈজ্ঞানিক সাহিত্য এ বিষয়ে সন্মত যে, বয়ঃসন্ধিকাল (বৃদ্ধ বয়সে নয়) থেকেই স্বপ্নের প্রভাব এবং তীব্রতা উভয়ই কমতে থাকে। এই বিবর্তনটা মেয়েদের চাইতে পুরুষদের মাঝে দ্রুত ঘটে থাকে।

স্বপ্ন নিয়ে কল্পকথার এখানেই শেষ ভাবার কোন সুযোগ নেই। আগামীতে আমরা আরও নতুন নতুন তত্ত্ব ও তথ্যের অপেক্ষায় থাকব।


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

dream, reasoning, mind, psycho, human, life, love, desire